মঙ্গলবার

কুঋণ কাকে বলে - বিস্তারিত

অনাদায়ী দেনা, কুঋণ বা অনাদায়ী পাওনা কি


এখানে যা থাকছে--

  • কুঋণ কি বা কাকে বলে
  • অনাদায়ী দেনা ও অনাদায়ী পাওনার পার্থক্য
  • কুঋণ কিভাবে হয়
  • কুঋণ এর জাবেদা ও হিসাব
  • কুঋণ সঞ্চিতি কেন ধরা হয়


কুঋণ কি বা কাকে বলে, অনাদায়ী দেনা ও অনাদায়ী পাওনার পার্থক্য, কুঋণ কিভাবে হয়, কুঋণ এর জাবেদা ও হিসাব, কুঋণ সঞ্চিতি কেন ধরা হয়
কুঋণ কি বা কাকে বলে


কুঋণ নিয়ে কিছু কথাঃ

আমরা অনেকেই ঋণ আর কুঋণ এর মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারি না। কারো কাছ থেকে সুদের বিনিময়ে অর্থ বা টাকা নেওয়াকে ঋণ (Loan) বলে। কিন্তু কুঋণ কোনো ঋণ নয়। এটি ঋণ এর সাথে সম্পর্কিত নয়। কুঋণ এর পরিচিতি সম্পর্কে সমস্যা দূর করতে আমাদের আজকের আলোচনা। কুঋণ কাকে বলে, কিভাবে কুঋণ এর সৃষ্টি হয়, কুঋণ হলে করণীয়, কুঋণ এর জাবেদা, হিসাব ও কুঋণ এর সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা।




কুঋণ সম্পর্কে জানার আগে যা জানা প্রয়োজনঃ

  • ১. দেনাদার- দেনাদার কে আধুনিক হিসাববিজ্ঞানে প্রাপ্য হিসাব বলা হয়ে থাকে। প্রাপ্য হিসাব বা দেনাদার সাধারন্ত বাকিতে পন্য বিক্রয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়ে থাকে। আবার বিনিয়োগ বা যে কোনো ভাবে কাওকে টাকা ধার দিলে বা কারো নিকট অর্থ, সম্পদ বা টাকা পাওয়া গেলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আমাদের নিকট বা আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিকট দেনা থাকে তাই সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আমাদের দেনাদার। অর্থাৎ আমাদের অর্থ যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্টানের নিকট থাকে যা আমরা ভবিষ্যতে পাবো তখন সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কে দেনাদার বলে।
  • ২. পাওনা টাকা- কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট কিছু পাওয়া যাবে এমন হলে আমরা যে পরিমান অর্থ পাবো সেই পরিমান অর্থ কে আমাদের পাওনা টাকা বলতে পারি। দেনাদারদের নিকট যে পরিমান অর্থ পাওয়া যাবে সেই পরিমাণ অর্থ বা টাকা কে পাওনা টাকা বলা হয়।
  • ৩. অনাদায়ী - অনাদায়ী বলতে আদায় হয়নি বা আদায় হবেনা এমন অর্থ কে বোঝানো হয়ে থাকে। 




কুঋণ কি বা কাকে বলেঃ

কুঋণ এর অপর নাম অনাদায়ী দেনা। অনাদায়ী দেনা কে অনাদায়ী পাওনা বলা যেতে পারে কারণ দেনাদার দের নিকট হতে আমরা যে টাকা কখনোই পাবো না বা আমাদের পাওনা টাকার যে পরিমাণ টাকা আর পাওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে হয় তাকেই অনাদায়ী টাকা বলে। তাই কু-ঋণ এর অপর নাম অনাদায়ী দেনা বা অনাদায়ী পাওনা। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেনাদারদের নিকট থেকে টাকা আদায় করা অসম্ভব হলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা দেনাদারকে অনাদায়ী দেনা বলে। অন্যদিকে দেনাদার দের নিকট থেকে যে পরিমাণ টাকা আর কখনো পাওয়া যাবে না বলে ধরা হয় সেই পরিমাণ টাকা অনাদায়ী পাওনা। সুতারং অনাদায়ী দেনা বললে যে টাকা দেবে না এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কে বোঝায় আর অনাদায়ী পাওনা বললে আদায় যোগ্য নয় এমন টাকা কে বোঝায়। তাই অনাদায়ী দেনা বা অনাদায়ী পাওনা উভয়ি কুঋণ। 



কুঋণ কখন হয় এবং কিভাবে হয়ঃ

প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে অনেক সময় ধার বা বাকিতে পন্য দ্রব্য বিক্রয় করতে হয়। যাদের নিকট বাকিতে পন্য বিক্রয় করা হয় তাদের দেনাদার বলা হয়। দেনাদার দের নিকট হতে আমাদের পাওনা টাকা অনেক সময় আদায় করতে সমস্যা দেখা দেয়। দেনাদার যদি অসাধু হয় বা সে যদি কোনো কারণে টাকা দিতে অসমর্থ হয় বা অস্বীকৃতি জানায় বা বারবার টাকা চাওয়া সত্ত্বেও যদি টাকা না দেয় তখন অনেক সময় ধরে নিতে হয় টাকা আর পাওয়া যাবে না, এমত অবস্থায় যে পরিমাণ টাকা পাওয়া যাবে না বলে ধরা হয় তাকে কুঋণ বা অনাদায়ী দেনা বা অনাদায়ী পাওনা বলে। আর এভাবেই কুঋণ বা অনাদায়ী দেনার উৎপত্তি হয়। কুঋণ চলতি সম্পদের ঘাটতি তাই একটি ব্যয় জাতীয় খরচ।




কুঋণ হলে করণীয়ঃ

কুঋণ বা অনাদায়ী দেনা বা অনাদায়ী পাওনা প্রতিষ্ঠানের এক ধরনের ক্ষতি। এটি এক ধরনের ব্যয় হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বছরের পর বছর যদি এভাবে কুঋণ বা অনাদায়ী দেনা হতে থাকে তবে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে বা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। কুঋণ থেকে রেহাই পেতে তাই প্রতিষ্ঠান নানান প্রকার কৌশল অবলম্বন করে থাকে। এমন একটি পদ্ধতির নাম কুঋণ সঞ্চিতি। কুঋণ সঞ্চিতির ব্যবস্থা করে অনাদায়ী দেনা বা কুঋণ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়। সাধারন্ত প্রতিবছর মুনাফার কিছু অংশ ভবিষ্যতে অনাদায়ী দেনা বা কুঋণ হতে পারে এমন ধরে সঞ্চয় করে রাখা হয় আর যে পরিমাণ টাকা কুঋণ বা অনাদায়ী দেনা মোকাবেলা করার জন্য সঞ্চয় করে রাখা হয় তাকে অনাদায়ী দেনা সঞ্চিতি বা কুঋণ সঞ্চিতি বলে।




কু-ঋণ কোন জাতীয় হিসাবঃ

বাকিতে পন্য বিক্রয়ের মাধ্যমে দেনাদারের সৃষ্টি হয় আর দেনাদার দের নিকট থেকে টাকা পাওয়া না গেলে তাকে কু-ঋণ বলে। অপর দিকে প্রতিষ্ঠানে পন্য বিক্রয় করা হয় আয়ের উদ্দেশ্যে,  যা একটি নির্দিষ্ট বছরে হিসাব নিকাশ করা হয়, অনাদায়ী দেনা বা কু- ঋণ বাকিতে বিক্রয় করে আয় করতে গিয়ে যে দেনাদারের সৃষ্টি হয় তা থেকে উৎপন্ন হয় যা এক ধরনের ক্ষতি বা লস। যেহেতু এই ক্ষতির হিসাব এক বছরের মাঝেই নিরূপন করা হয়, আর এক বছরের মাঝে আয় করতে গিয়ে যে ব্যয় বা ক্ষতি হয় তাকে মুনাফা জাতীয় ব্যয় বলে, তাই অনাদায়ী দেনা বা কু-ঋণ কে মুনাফা জাতীয় ব্যয় হিসাবে নিরূপণ করা হয়।




কুঋণ এর সাথে জড়িত হিসাব ও জাবেদাঃ

কুঋণ এর সাথে জড়িত সাধারন্ত দুটি পক্ষ রয়েছে। কুঋণ এর ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বৃদ্ধি পায় আবার কুঋণ হওয়ার ফলে যাদের নিকট থেকে টাকা পাওয়া যেত বা দেনাদার বা প্রাপ্য হিসাব সম্পদ হিসাবে আর কখনো রাখা যায় না কারণ দেনাদার আর টাকা দেবেনা বলে ধরা হয় ফলে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হ্রাস পায়। সুতারং কুঋণ এর সাথে জড়িত দুটি পক্ষ হলো কুঋণ হিসাব এবং বিবিধ দেনাদার বা প্রাপ্য হিসাব। নিম্নে জাবেদায় ডেবিট ক্রেডিটের কারণ সহ তুলে ধরা হলো-


  • কুঋণ হিসাব--ডে. (ব্যয় বৃদ্ধি)
  • বিবিধ দেনাদার বা প্রাপ্য হিসাব--ক্রে. (সম্পদ হ্রাস)




উদাহরণ এর সাহায্যে কুঋণ বিশ্লেষণঃ

মনেকরি ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি রোদেলা লিঃ এর নিকট বাকিতে ৫০ টাকার পন্য বিক্রয় করা হলো। এমত অবস্থায় আমরা নিশ্চিৎ আমাদের হিসাবের খাতায় উক্ত লেনদেনের জাবেদা হিসেবে লিপিবদ্ধ করবো-


  • প্রাপ্য/দেনাদার হিসাব--ডে.----৫০/-(সম্পদ বৃদ্ধি)
  • বিক্রয় হিসাব--ক্রে.----৫০/-(আয় বৃদ্ধি)


প্রাপ্য বা দেনাদার প্রতিষ্ঠানের সম্পদ তাই প্রাপ্য বা দেনাদার হিসাবে ৫০/- ডেবিট করা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর রোদেলা লিঃ এর নিকট পাওনা টাকা চাওয়া হলো কিন্তু পাওয়া গেল না। এর পর কয়েক মাস পর আবার চাওয়া হলো তবুও পাওয়া গেল না। এর পর মাস কেটে গেল, বছর কেটে গেল বারবার রোদেলার কাছে পাওনা ৫০/- টাকা চেয়েও পাওয়া গেল না। কি আর করা এক সময় ধরে নেওয়া হলো রোদেলা লিঃ ৫/- টাকা আর কখনো দেবে না। আর যদিও দেয় তবে বারবার রোদেলা লিঃ এর কাছে ৫/- চাইতে গেলে যাতায়াত ভাড়া ৫/- বেশি হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা আর ৫/- চাইতে গেলাম না। অন্যদিকে রোদেলা লিঃ ও ৫/- কয়েক বছর পার হলেও আমাদের দিলো না। রোদেলা লিঃ আমাদের দেনাদার বা প্রাপ্য হিসাব ছিল তাই ডেবিট করা হয়েছিল। কিন্তু ৫ টাকা ফেরত না পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়াই রোদেলা লিঃ কে আর সম্পদ হিসাবে রাখা যায় না, ডেবিট ছিল তাই এখন ক্রেডিট করতে হবে কারণ ৫/- টাকা আর চাওয়া হবে না বা পাওয়া যাবে না বলে ধরতে হবে। এমতাবস্থায় কুঋণ বা অনাদায়ী পাওনা হিসাবে জাবেদায় লিপিবদ্ধ করে রোদেলা লিঃ এর নামে যে হিসাব ছিল তা বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ টাকা আর পাওয়া যাবে না ধরায় লেনদেনটি হবে, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর - রোদেলা লিঃ এর নিকট ৫/- পাওনা টাকা আর কখনো আদায় হবে না বলে ধরতে হবে অর্থাৎ কুঋণ হিসাবে ৫/- ধরতে হবে বা কুঋণ ধার্য করা হল ৫/- টাকা বা কুঋণ হিসাবে ৫/- অবলোপন করতে হবে বা দেনাদারদের উপর ৫/- টাকা কুঋণ হিসাবে অবলোপন বা বাদ দিতে হবে। নিম্নে লেনদেনটির হিসাব ও জাবেদা দেখানো হলো-


  • অনাদায়ী দেনা/কুঋণ হিসাব--ডে.----৫০/-(ব্যয় বৃদ্ধি)
  • প্রাপ্য/দেনাদার হিসাব--ক্রে.----৫০/-(সম্পদ হ্রাস)


এখানে অনাদায়ী দেনা বা অনাদায়ী পাওনা বা কুঋণ এক ধরনের ব্যয় বা ক্ষতি তাই ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেবিট করা হয়েছে। অপর দিকে প্রাপ্য বা দেবাদার হিসাবে ৫/- টাকা আর রাখা যাবে না তাই সম্পদ হ্রাস পাবে, সম্পদ হ্রাস পেলে ক্রেডিট হয় তাই প্রাপ্য হিসাব বা দেনাদার হিসাব কে ক্রেডিট করা হয়েছে।




আজকের আলোচনার মাধ্যমে আশাকরি কুঋণ সম্পর্কে সঠিক ধারনা দিতে পেরেছি। কুঋণ দেনাদার দের নিকট পাওনা টাকার যে অংশ আদায় যোগ্য নয় এমন অংশের নাম বা অনাদায়ী অংশ। কুঋণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করতে ভুলো না। আশা করি কুঋণ সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করতে চেষ্টা করবো।




সকলের শুভকামনায় -

কে-মাহমুদ

৩০-০৩-২০২১

2 comments

কুঋণ কেন মুনাফা জাতীয় ব্যয়?

বিক্রয় করা হয় আয়ের উদ্দেশ্যে এবং একটি নির্দিষ্ট বছরে বিক্রয়ের হিসাব নিকাশ করা হয়ে থাকে, অনাদায়ী দেনা বা কু- ঋণ বাকিতে বিক্রয় করে আয় করতে গিয়ে যে দেনাদারের সৃষ্টি হয় তা থেকে উৎপন্ন হয় যা ধরনের ক্ষতি বা লস এবং এই ক্ষতির হিসাব এক বছরের মাঝেই নিরূপন করা হয়, আর একবছরের মাঝে আয় করতে গিয়ে যে ব্যয় বা ক্ষতি হয় তাকে মুনাফা জাতীয় ব্যয় বলে, তাই অনাদায়ী দেনা বা কু-ঋণ কে মুনাফা জাতীয় ব্যয় হিসাবে নিরূপণ করা হয়। বিস্তারিত জানতে 1timeschool.com এ মুনাফা ও মুলধন জাতীয় হিসাবের আরটিকেল গুলো দেখুন।

1timeschool.com এর পক্ষে,
রোদেলা

নিচের বক্সে কমেন্ট করুন। আপনার প্রতিটি কমেন্ট আমাদের নিকট খুবি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার কমেন্টের উত্তর আমরা যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব দিতে চেষ্টা করবো। আমাদের সাথেই থাকুন।
1timeschool.com
EmoticonEmoticon